কয়লার বদলে ময়লা থেকে বিদ্যুৎ?

মল-মূত্র, পয়ঃ-প্রণালী, এ সবের কথা উঠলে আর যা-ই মনে পড়ুক – নিজের মোবাইল ফোনের ব্যাটারি চার্জ করার কথা মনে করেন কি কেউ? কিন্তু লাইপসিগের বিজ্ঞানীরা ঠিক তাই নিয়েই গবেষণা চালাচ্ছেন৷
লাইপসিগের হেল্মহলট্স পরিবেশ গবেষণা কেন্দ্রের একটি শৌচাগার৷ এই খাটা পায়খানায় যা জমা হয়, তা লাগে গবেষণার কাজে৷ গবেষণা প্রতিষ্ঠানটির নাম ইনস্টিটিউট ফর এনভায়রনমেন্টাল মাইক্রোবায়োলজি৷ বিজ্ঞানীরা পরীক্ষা করে দেখছেন, ইলেক্ট্রোঅ্যাকটিভ ব্যাকটেরিয়া দিয়ে মল থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব কিনা৷
এক্সপেরিমেন্টের আগে স্যাম্পল নিতে হয়৷ লাইপজিগের জার্মান বায়োমাস গবেষণা কেন্দ্রের গবেষক ইয়র্গ ক্রেট্সমার জানালেন, ‘‘গোড়ায় একটু ঘেন্না হতো বৈকি; কিন্তু দু-তিনবার করার পর অভ্যেস হয়ে যায়৷ আমরা এটাকে বলি সাবস্ট্রেট, এক্সপেরিমেন্টে যা কাজে লাগে৷ আমাদের সহকর্মীরা নিয়মিতভাবে এই পায়খানা ব্যবহার করেন, ফলে আমরা পর্যাপ্ত সাবস্ট্রেট পাই৷''
মানুষের মলে প্রধানত জল, খাবার-দাবারের যে অংশ হজম হয়নি, সে' অংশ, ‘রাফেজ' বা ডায়েটারি ফাইবার, স্নেহজাতীয় পদার্থ ও স্বভাবতই জীবাণু থাকে৷ এই সব জীবাণুরা ভাসা সব পদার্থ থেকে পুষ্টি সংগ্রহ করে৷ সেক্ষেত্রে কিছু কিছু জীবাণু বিদ্যুৎ উৎপাদন করে৷
বিশেষ বিশেষ জীবাণু যে
বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারে, সেটা একশ বছরের বেশি সময় ধরে জানা৷ গত শতাব্দীর ষাটের দশকে নাসা মহাশূন্যে জীবাণুর মাধ্যমে প্রস্রাব থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করার চেষ্টা করেছিল৷ এ জন্য জীবাণুদের ইলেকট্রন নিঃসরণ করার ক্ষমতা থাকা চাই৷ হেল্মহলট্স পরিবেশ গবেষণা কেন্দ্রের ড. ফাল্ক হার্নিশ বললেন, ‘‘জীবাণুরা সর্বত্রই আছে, যেমন পাকস্থলী কিংবা মলে, যে কারণে খাটা পায়খানাতেও জীবাণুরা থাকে৷ কিন্তু এই জীবাণুগুলোর বিশেষত্ব হলো এই যে, তারা নিজের অভ্যন্তর থেকে ইলেকট্রন বার করে তা কোষের ঝিল্লির মাধ্যমে বাইরে পাঠাতে পারে৷''
‘মাত্র কয়েক মিলিঅ্যাম্পিয়ার বিদ্যুৎ'
জীবাণুগুলো যে সব ইলেকট্রন ছাড়ে, সেগুলোকে একটি ইলেক্ট্রোডে ধরা হয়৷ জীবাণুরা ভাসা পদার্থ খেয়ে ফেলে, অর্থাৎ বর্জ্য অপসারণ করে পানি পরিশোধন করে; অপরদিকে তারা ইলেকট্রন ছাড়ে, অর্থাৎ বিদ্যুৎ উৎপাদন করে৷ এভাবে যে বিদ্যুৎ তৈরি হয়, তা পরিমাণে খুব কম হলেও, ল্যাবরেটরিতে তার পরিমাপ করা যায়৷
বায়ো-ইলেকট্রো-কেমিস্ট ড. ফাল্ক হার্নিশ বলেন, ‘‘বর্তমানে আমরা মাত্র কয়েক মিলিঅ্যাম্পিয়ার বিদ্যুৎ তৈরি করতে পারি৷ কিন্তু বাইরে যে শৌচাগার দেখেছেন, তার কথা ভাবলে বলতে হয়, আমরা একটা মোবাইল টেলিফোনের ব্যাটারি ১২ ঘণ্টার মধ্যে রি-চার্জ করে দিতে পারি৷''
নেগেটিভ চার্জ যুক্ত ইলেকট্রনগুলো পজিটিভ চার্জ যুক্ত ইলেক্ট্রোডের দ্বারা আকৃষ্ট হয়৷ এর থেকে যে কারেন্ট বা বিদ্যুৎপ্রবাহ সৃষ্টি হয়, তা মোবাইল ফোন চার্জ করে; মাইনাস পোলে তৈরি হয় জল৷ জীবাণুরা আরো ভাসা পদার্থ খাওয়ার ফলে জল ক্রমেই আরো পরিষ্কার হয়ে ওঠে৷ জীবাণুরা এইভাবে বিদ্যুৎ সৃষ্টি করলে একে বলা হয় একটি মাইক্রোবিয়াল ফুয়েল সেল – অর্থাৎ জীবাণু-পরিচালিত-জ্বালানি-কোষ৷ এটা যাতে অপেক্ষাকৃত অনুন্নত দেশেও সম্ভব হয়, সেজন্য লাইপসিগের বিজ্ঞানীরা এই সংক্রান্ত প্রযুক্তিকে যতদূর সম্ভব সহজ রেখেছেন৷
ড. ফাল্ক হার্নিশ জানালেন, ‘‘আমাদের প্রযুক্তির বিশেষত্ব হলো এই যে, আমরা করোগেটেড কার্ডবোর্ড থেকে ইলেক্ট্রোড তৈরি করি, এখানে যেমন দেখছেন৷ অর্থাৎ বাজারে যেরকম পিচবোর্ড পাওয়া যায়, তা নিলেই চলে৷ পরে তা কাঠকয়লার মতো বাতাসশূন্য অবস্থায় পোড়ালেই ইলেক্ট্রোডের পদার্থ পাওয়া যায়৷ একটা কম খরচের লো-টেক পণ্য৷''
জীবাণু-পরিচালিত-জ্বালানি-কোষের কথা ভাবলে পয়ঃপদার্থ সম্পর্কে ধারণাই পাল্টে যায়৷ কেননা এই কোষ পয়ঃপদার্থ থেকে জ্বালানি সৃষ্টি করে এবং পানিকে পরিশুদ্ধ করে – শুধু শৌচাগারেই নয়, বড় বড় সিউয়েজ ওয়ার্কস-এও বটে৷