ভূমিকম্পঃ আপনার করণীয়

কোনো রকম পূর্বাভাস ছাড়াই হঠাৎ ভূপৃষ্ঠ কেঁপে ওঠাকে ভূমিকম্প বলে। মাত্র কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে এই কাঁপুনি ছড়িয়ে পড়ে দূর-দূরান্তে। ভূমিকম্পের বিস্তৃতিকে পানির ঢেউয়ের সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে। স্থীর পুকুরের পানিতে ঢিল ছুড়ে দিলে নিক্ষিপ্ত স্থানের চারপাশে পানির ঢেউ যেভাবে ছড়িয়ে পড়ে, ভূমিকম্পও উৎপত্তিস্থল থেকে ঠিক সেভাবে ছড়িয়ে যায়। আর এ ঘটনা ঘটে মাত্র কয়েক সেকেন্ডের ব্যাবধানে। কম্পনের মাত্রা অনেক বেশি হলে মালামালের ক্ষয়ক্ষতি এবং প্রাণনাশ হতে পারে। তবে ভূমিকম্পের মাত্রা সহনীয় থাকলে কোনো রকম ক্ষয়ক্ষতি ছাড়া প্রাণে বেঁচে যাওয়া সম্ভব। অথচ এমন পরিস্থিতিতেও অনেকে ভয়ে দিশেহারা হয়ে এদিক ওদিক ছোটাছুটি করে। উচু তলা থেকে লাফ দিয়ে প্রাণ বাঁচাতে চায় অথবা দৌড়ে নিচে পালায়। এতেই তারা বেশি বিপদ ডেকে আনেন। কারণ ভূমিকম্পের সামান্য ওই সময়ে দৌড়ে প্রাণ বাঁচানো সম্ভব নয়। তবে এমন সময়ে নিজেকে রক্ষা করার জন্য কিছু জরুরি ব্যবস্থা নেয়া যেতে পারে। যা আপনাকে হঠাৎ ভূমিকম্পের সময় সাহায্য করবে।
* ভূমিকম্পের প্রথম ঝাঁকুনির সঙ্গে সঙ্গে খোলা জায়গায় আশ্রয় নিন।
* ঘরে হেলমেট থাকলে মাথায় পরে নিন, অন্যদেরও পরতে বলুন।
* ঘর থেকে বের হওয়ার সময় সম্ভব হলে আশপাশের সবাইকে বের হয়ে যেতে বলুন।
* দ্রুত বৈদ্যুতিক ও গ্যাসের সুইচ বন্ধ করে দিন।
* কোনো কিছু সঙ্গে নেওয়ার জন্য অযথা সময় নষ্ট করবেন না।
* যদি ঘর থেকে বের হওয়া না যায়, সে ক্ষেত্রে ইটের গাঁথুনি দেওয়া পাকা ঘর হলে ঘরের কোণে এবং কলাম ও বিমের তৈরি ভবন হলে কলামের গোড়ায় আশ্রয় নিন।
* আধাপাকা বা টিন দিয়ে তৈরি ঘর থেকে বের হতে না পারলে শক্ত খাট বা চৌকির নিচে আশ্রয় নিন।
* ভূমিকম্প রাতে হলে কিংবা দ্রুত বের হতে না পারলে সজাগ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আশ্রয় নিন ঘরের কোণে, কলামের গোড়ায় অথবা শক্ত খাট বা টেবিলের নিচে।
* গাড়িতে থাকলে যথাসম্ভব নিরাপদ স্থানে থাকুন। কখনো সেতুর ওপর গাড়ি থামাবেন না।
* এ সময় লিফট ব্যবহার করবেন না।
* যদি বহুতল বাড়ির ওপরের দিকে কোনো তলায় আটকা পড়েন, বেরিয়ে আসার কোনো পথই না থাকে, তবে সাহস হারাবেন না। ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করুন। ভেবে দেখুন, উদ্ধারকারী পর্যন্ত আপনার চিৎকার পৌছাবে কি না।
* বিম, দেয়াল, কংক্রিটের ছাদ ইত্যাদির মধ্যে আপনার শরীরের কোনো অংশ চাপা পড়লে, বের হওয়ার সুযোগ যদি না-ই থাকে, তবে বেশি নড়াচড়া করবেন না। এতে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ হতে পারে।
* ধ্বংসস্তূপে আটকে গেলে সাহস হারাবেন না। যেকোনো উত্তেজনা ও ভয় আপনার জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।
সতর্কতা ও সচেতনতা
* ভূমিকম্প সম্পর্কে সঠিক ধারণা নিন।
* এর ঝুকি ও করণীয় সম্পর্কে অবহিত থাকতে হবে।
* ভূমিকম্পের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা করতে সার্বক্ষণিক প্রস্তুতি থাকতে হবে।
* এলাকাভিত্তিক স্বেচ্ছাসেবক দল গড়ে তুলতে হবে।
* ভূমিকম্পে আহতদের জন্য জরুরি চিকিৎসাসেবার ব্যবস্থা করতে হবে।
* বিভিন্ন প্রশিক্ষণ, সভা, সেমিনার এবং গণমাধ্যমের সাহায্যে জনগণের সচেতনতা বাড়াতে হবে।
* বাড়ি বানানোর প্রকৌশলী, এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তি, বাড়ির মালিক ও মেরামতের সঙ্গে জড়িত লোকদের যথাযথ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে।
* ভূমিকম্প প্রকৌশল কোর্স চালু করা দরকার।
* স্কুল, হাসপাতাল ও দমকলের মতো অত্যাবশ্যকীয় প্রতিষ্ঠানের গঠন সুচারুভাবে করা উচিত।
* গৃহীত পরিকল্পনার বাস্তবায়ন করতে হবে।
* বাড়ি ও অন্যান্য স্থাপনা নির্মাণ আইন অনুযায়ী তৈরি করলে দুর্যোগ মোকাবিলা করা সম্ভব।
* বাড়ি বানানোর সময় অবশ্যই তীব্রতা-সহনশীল করে তৈরি করতে হবে। আমরা না বুঝে ম্যাগনেচুড বা মাত্রা-সহনশীল তৈরি করে থাকি, যা ঠিক নয়। তীব্রতা-সহনশীল পদ্ধতি ভূমিকম্পের ক্ষয়ক্ষতির ব্যাপকতা নির্দেশ করে। ভূমিকম্প হয়ে যাওয়ার পরপরই এটি মাপা হয়। ভূমিকম্পের ব্যাপকতা বোঝাতে ভয়াবহ, প্রচণ্ড, মাঝারি, মৃদু ইত্যাদি বিশেষণ ব্যবহার করা হয়।